Home | অপরাধ | খুনের পর মরদেহের পাশে বসে রাতভর গান শোনেন খুনি

খুনের পর মরদেহের পাশে বসে রাতভর গান শোনেন খুনি

দীর্ঘ দুই বছর ধরে রেজাউল হোসেন শাকিলের (১৮) সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিলো আরাফাত হোসেনের (১৭)। মাদকাসক্ত দুই বন্ধু মিলে প্রায়ই একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করতেন। ইয়াবা কেনার টাকার দেনা-পাওনার হিসাবে এক সময় তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। এ মনোমালিন্য থেকে শাকিলকে খুনের পরিকল্পনা করেন আরাফাত।

পরিকল্পনা অনুযায়ী শাকিলকে মাদক সেবন করিয়ে অচেতন করে নৃশংসভাবে খুন করেন আরাফাত। তারপর বন্ধুর মরদেহের পাশে বসেই রাতভর গান শোনেন তিনি। ভোরে কৌশলে পালিয়ে গিয়ে সাজান অপহরণের নাটক।

তবে কোনো কিছুতেই শেষ রক্ষা হয়নি আরাফাতের। ঘটনার পরদিনই পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার জবানবন্দিতে বন্ধুকে খুন করার লোমহর্ষক বর্ণনা বেরিয়ে আসে।

মঙ্গলবার (০৮ মে) রাতে গুলশান নিকেতনের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার অফিস থেকে কর্মী শাকিলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন রাতেই শাকিলের বাবা বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। শ্বাসরুদ্ধকর কয়েকঘণ্টার অভিযান শেষে নিজ বাসা থেকে আরাফাতকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

নিহত শাকিলের বাবার নাম নূরের নবী। তার গ্রামের বাড়ি ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গুলশানের ওই অফিসে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন এবং অফিসেই থাকতেন।

এদিকে খুনি আরাফাতের বাবার নাম মিলন মিয়া। তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে। তিনি পরিবারের সঙ্গে গুলশান ২ নম্বর রোডের ১১৫ নম্বর বাসায় থাকতেন। তিনি তিব্বত কোম্পানির গ্যারেজে মেকানিকস হিসেবে কাজ করতেন।

আরাফাতের জবানবন্দির বরাত দিয়ে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় রাতেই শাকিলের অফিসে বসে দুই বন্ধু ইয়াবা সেবন করতো। অর্থের অভাবে তারা কখনো একটা ইয়াবা দু’জনে মিলে সেবন করতো। ইয়াবা কেনার জন্য শাকিল আরাফাতের কাছ থেকে প্রায় ২৫ হাজার টাকা ধার নেয়। সেই পাওনা টাকা চাইতে গেলে শাকিল টাকা পাওনার কথা অস্বীকার করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্যের জেরে শাকিলকে খুন করে তার বাবার কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের

চিন্তা করেন আরাফাত।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবার (৭ মে) সন্ধ্যার পর শাকিলের অফিসে যান আরাফাত। এরপর একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করেন এবং কৌশলে শাকিলকে ৪টি বিয়ার পান করান আরাফাত।

একপর্যায়ে রাত ১১টার দিকে শাকিল অচেতন হয়ে গেলে ওই রুমে থাকা দড়ি দিয়ে প্রথমে তার পা বেঁধে ফেলেন। তারপর আরেকটি দড়ি দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে প্রায় আধাঘণ্টা টেনে ধরে রাখেন আরাফাত। বন্ধুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর পাশের রুমে কম্পিউটারে রাতভর গান শোনেন খুনি আরাফাত।

মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শাকিলের টি-শার্ট খুলে নিজে পড়েন আর নিজের টি শার্ট একটি ব্যাগে ঢুকিয়ে নেন। সঙ্গে শাকিলের মোবাইল দু’টিও নেন। শাকিলের মরদেহ ভেতরে রেখে ওই রুম এবং অফিসের মেইন গেটে তালা দিয়ে চাবিগুলো নিয়ে নেয় সে।

ভবনের নিচে এসে দারোয়ানকে বলে গেট খুলে বের হয়ে যায়। তারপর গুলশান ১ নম্বর একটি খালি প্লটে গিয়ে শাকিলের টি-শার্ট পাল্টে নিজের টি-শার্ট পড়ে এবং চাবিগুলো সেখানে ফেলে বাসায় চলে যায়।

তারপর পরিকল্পনা অনুযায়ী শাকিলের মোবাইল ফোনে তার বাবাকে ফোন করে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন আরাফাত। বেলা ১২টার দিকে শাকিলের বাবা বিষয়টি গুলশান থানা পুলিশকে জানায়।

এদিকে, শাকিলের ফোন বন্ধ পেয়ে এবং অফিসের দরজা বন্ধ পেয়ে তার অফিসের কর্মীরাও পুলিশকে বিষয়টি জানায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন বাংলানিউজকে বলেন, শাকিলের বাবার কাছে প্রথমে দুই লাখ, পরে এক লাখ এবং পরে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন আরাফাত। শাকিলের বাবাকে গুলশান লেকের একটা নির্ধারিত স্থানে টাকা রেখে আসতে বলা হয়। পুলিশের পরামর্শে সেখানে নকল টাকা রেখে ওই এলাকায় পুলিশ অবস্থান নেয়। কিন্তু দিনভর অপেক্ষা করেও কেউ টাকা নিতে না আসায় অফিসের দরজা ভেঙে শাকিলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) আমিনুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, আমরা ওই অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে এবং শাকিলের ফোন নম্বর ট্যাকিং করে আরাফাতের অবস্থান শনাক্ত করি। তারপর মধ্যরাতে নিজ বাসা থেকে আরাফাতকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে শাকিলের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

তিনি বলেন, আরাফাত আদালতে পুরো ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কিশোর অপরাধী হিসেবে আদালত তাকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

About admin

Check Also

দুই হাজার টাকা নিয়ে বিবাদ, খুনি ভাড়া ৩০ হাজারে

বিবাদের শুরুটা হয়েছিল ২০১৬ সালে এক হাজার টাকা নিয়ে। সেই বিবাদ গিয়ে ঠেকল খুনোখুনিতে। খুনি …