Breaking News
Home | অনুসন্ধান | সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া মিঠুনকে থামাবে কে?

সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া মিঠুনকে থামাবে কে?

‘আমি বারবার ফোন দিতে পারবো না। সব প্রতিষ্ঠান আমাকে চাঁদা দেয়। আপনিও মাসের ১০-১২ তারিখের মধ্যে চাঁদা দেবেন’- না এটা কোনো সন্ত্রাসীর কথা নয়! সাভারের দীপ ক্লিনিকের পরিচালক ডা. সিরাজুল ইসলামকে এভাবেই মোবাইল ফোনে হুংকার দিচ্ছিলেন বারিধারায় অবস্থিত একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সাভার প্রতিনিধি মিঠুন সরকার।

ওই চিকিৎসকের সঙ্গে মিঠুন সরকারের ফাঁস হওয়া এই ‘কল রেকর্ড’ সাভারে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে এখন ভাইরাল।

ঢাকা থেকে আসা সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার নামে ডা. সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে তিন দফায় ৭২ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছেন মিঠুন।

মিঠুন টেলিফোনে চাঁদা চাইছেন, হুংকার দিয়েছেন, চাঁদা আদায়ের জন্য লোক পাঠাচ্ছেন- প্রমাণ হিসেবে কল রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও হয়রানির ভয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পাননি ডা. সিরাজ।

ডা. সিরাজ একটি উদাহরণ মাত্র। এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে এই সাংবাদিকের কর্মকাণ্ড নিয়ে। সাভারবাসী এক রকম জিম্মি সাংবাদিক নামে এই চাঁদাবাজের হাতে।

তার লাগামহীন চাঁদাবাজি, প্রতারণা, মারধর আর ব্ল্যাক মেইলিংয়ে অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে। তবে একে একে ফাঁস হতে শুরু হয়েছে মিঠুন সরকারের নানা অপকর্মের খতিয়ানও।
এতদিন ভয়ে অনেকেই মুখ খোলার সাহস পাননি। যারা সামান্য প্রতিবাদ করেছেন, মামলা করেছেন, উল্টো তাদের নাজেহাল হতে হয়েছে পদে পদে।

যেমন নাজেহাল হয়েছেন একটি প্রথম সারির দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টারও। ঘটনাটি ২০১৩ সালের। চাঁদা না পেয়ে ভাড়াটে এক নারীকে ব্যবহার করে এক ব্যবসায়ীকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন মিঠুন সরকার। তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলে নিজ এলাকাতেই গণধোলাই দেওয়া হয় তাকে।

‘চাঁদা দাবি, হয়রানির অভিযোগে সাংবাদিককে গণধোলাই’ শিরোনামে ওই দৈনিকটিতে মিঠুন সরকারের বিরুদ্ধে তিন কলামে খবর প্রকাশিত হলে চরম হেনস্থার শিকার হতে হয় প্রভাবশালী ওই দৈনিকটির স্টাফ রিপোর্টারকে।

তার হাত থেকে রেহাই পায়নি ওই দৈনিকসহ অপর একটি দৈনিকের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিও।

সাভারের খ্রিস্টান পাড়ায় চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ফের গণধোলাইয়ের শিকার হন মিঠুন সরকার।

সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থানীয় ইস্যুতে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন মিঠুন সরকার/ফাইল ফটো

ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকরা। মিঠুন সরকার সেই মানববন্ধনের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেন। পরে তিনি সেটা নিজের উপর ‘হামলার’ প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করেছিলেন ওই চ্যানেলটিতে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দুই সাংবাদিক বিষয়টির প্রতিবাদ করেছিলেন মাত্র। ব্যস, তাদেরও লাঞ্ছিত হতে হয় মিঠুনের হাতে।

এভাবে সাংবাদিক থেকে সাধারণ ব্যবসায়ী- কেউই রেহাই পায়নি তার মারধর, চাঁদাবাজি আর প্রতারণার হাত থেকে।

‘দেশবাংলা ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম’ নামে সাংবাদিক প্রশিক্ষণের ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠান খুলেও মিঠুন সরকার অনেকের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন।

তার গ্রেফতার দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ, বিক্ষোভ কর্মসূচি, এমনকি মানববন্ধন করেছেন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীরা আদালত ও থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মিঠুনের চাঁদাবাজি, প্রতারণা, নারী নির্যাতন, সমকামিতার ফিরিস্তি নিয়ে আনাচে কানাচেও দেখা মিলছে লিফলেট, পোস্টার। তবুও গ্রেফতার হননি মিঠুন সরকার। এতসব অভিযোগ সত্ত্বেও টিভি কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

মিঠুনকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে অনুষ্ঠিত একটি মানববন্ধনভুক্তভোগীরা বলেছেন, মিঠুন সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হলেও তা কখনোই আমলে নেয়নি বেসরকারি ওই টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ। এমনকি নিরপেক্ষভাবে তদন্তও করা হয়নি তার অপরাধের খতিয়ান। বরং, ঘটনা উল্টিয়ে মিঠুনের মনগড়া আর মিথ্যা ছলনার জালেই ফেঁসে আছেন চ্যানেলটির কর্তৃপক্ষ। যে কারণে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন সাংবাদিক পরিচয়ধারী এই চাঁদাবাজ। মিঠুন সরকার/ফাইল ফটো

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসীনুল কাদির বাংলানিউজকে বলেন, মিঠুন সরকার দুষ্টু প্রকৃতির, ধুরন্ধর। তার বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানা ও আদালতে এ পর্যন্ত ১২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি মামলা বিচারাধীন।

তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান ওসি।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক, সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি কৃষিবিদ ড. রফিকুল ইসলাম ঠান্ডু মোল্লা বাংলানিউজকে বলেন, মিঠুনের মতো একটা নোংরা ও কুকর্মের হোতাকে যারা নিয়োগ দিয়েছেন, তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত।

মুক্তিযোদ্ধা ম. হামিদ রঞ্জু বলেন, সাংবাদিতার নামে মিঠুন সরকার চাঁদাবাজি আর অপসাংবাদিকতা করে স্থানীয়ভাবে চ্যানেলটির ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এরপরও তারা কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় আমরা ব্যথিত, ক্ষুব্ধ।

সাভারের সিটি সেন্টার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর রহমান অভি জানান, এক লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে মিঠুন সরকার সিটি ফুড প্যালেস নামে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার শাহীন গাজীকে মারধর করেন। সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা এই ফুটেজ দেখানোর পরও বেসরকারি টেলিভিশনটির কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

মিঠুনের হাতে কি তারাও জিম্মি! তার চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলেই ব্যবসায়ীদের বানানো হয় জামায়াত-শিবির, কখনো নাশকতাকারী। এটা কি ধরনের সাংবাদিকতা?- প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সাভার প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট তুহিন খান জানান, এটা ঠিক যে তার বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে সাভারবাসী অতিষ্ঠ। ধরেন কোনো রেস্টুরেন্টে তিনি গিয়েছেন, খেয়ে দেয়ে বিল না দিয়ে বলবেন, এখানে তো মরা মুরগি দিয়ে খাবার তৈরি করা হয়। প্রতিবাদ করলেই মারধর, মিথ্যা সংবাদ প্রচার। এগুলো তো সাংবাদিকতার শ্রেণীতে পড়ে না। স্রেফ মাস্তানি। তাই প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মিঠুন সরকারকে সর্বসম্মতিক্রমে আজীবনের জন্য ক্লাব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে টেলিভিশন চ্যানেলটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মিঠুনের নানা অপকর্ম দেরিতে হলেও তাদের গোচরে এসেছে। এতদিন সে নানা ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত করেছে। আমরা খতিয়ে দেখেছি। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের প্রমাণও আমাদের হাতে এসেছে। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

About admin

Check Also

বাবা ডেকেও রেহাই মেলেনি লুৎফার

এটা শুধু একদল নারীর স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প নয়। বরং তাদের নিয়তি আর জীবন কীভাবে তছনছ …