Breaking News
Home | টেলিগ্রাফ | গডফাদারদের আশ্রয়স্থল ভারত

গডফাদারদের আশ্রয়স্থল ভারত

ঘোষণা দিয়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরুর পর গা-ঢাকা দিয়েছে ঢাকাসহ সারা দেশের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর তালিকাভুক্ত শীর্ষ ১০০ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে ৩৭ গডফাদারও থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজধানীর বাইরে বেশিরভাগ গডফাদারই গা-ঢাকা দিয়েছে। অনেকেই পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ২ ডজন মামলার আসামী ইউসুফ গ্রেফতার এড়াতে ভারতে পাড়ি দিয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী যে সব জেলা দিয়ে মাদকদ্রব্য দেশে পাচার হয়, সে সব জেলার গডফাদাররা ইতোমধ্যে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফ-কক্সবাজারের অধিকাংশ মাদক ব্যবসায়ী এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলা রাজশাহী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, কুমিল্লা, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দিনাজপুর, জয়পুরহাটের মাদক সম্রাটরা গত কয়েক দিনে উধাও। অনেকেই ধারণা সীমান্ত পেরিয়ে তারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ীরা তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। রাজশাহী অঞ্চলের এক মাদক ব্যবসায়ী জানান, হেরোইনের আন্তর্জাতিক রুট রাজশাহীর গোদাগাড়ির মাদক সম্রাটদের কেউ পদ্মার চরে, কেউবা বরেন্দ্র অঞ্চলে আবার কেউ কেউ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।
দেশব্যাপী চলমান মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে সাড়ে ৮ হাজারের বেশি মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার জনের। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে গতকাল শুক্রবার ভোর পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলো- সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ইউনুস আলী, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মোস্তাক আহমদ, রাজধানীর মহাখালী এলাকার কামরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ নগরের রাজন, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কামাল ওরফে ফেন্সি কামাল, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার শামীম হোসেন, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার জুয়েল মিয়া ও নেত্রকোনা সদরের অজ্ঞাত দুই ব্যক্তি। এ নিয়ে গত ২২ দিনের অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে ৬০ জনেরও বেশি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি নিহতরা সবাই মাদক ব্যবসায়ী। মাদক উদ্ধার ও চিহ্নিত ব্যবসায়ীদের ধরতে গিয়ে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটছে। তবে নিহতদের কারো কারো স্বজনের দাবি, আটক বা তুলে নেয়ার পর তাদের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যাচ্ছে।

দেশব্যাপী এ অভিযানে এখন পর্যন্ত কোনো গডফাদার বা মূলহোতার গ্রেফতার অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। যারা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে তাদের অধিকাংশই তৃতীয় অথবা মাঝারী শ্রেণির মাদক ব্যবসায়ী। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মাদকের তালিকায় আছেন বর্তমান ও সাবেক ২৫ জন সংসদ সদস্য। এর বাইরে আছেন আরও ৪০০ জনপ্রতিনিধি। যাদের অধিকাংশই সরকারীদলের সমর্থক ও নেতা। এদের কেউ এখনও ধরা পড়েনি। সে হিসাবে গডফাদাররা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মাদক ব্যবসায়ী যতো প্রভাবশালী হোক না কেনো কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে বলেছেন, মাদকের ব্যাপারে রাঘববোয়াল-চুনোপুটি কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তালিকায় নাম থাকার পরেও মাদকের গডফাদার, প্রভাবশালী, বিনিয়োগকারী, আশ্রয়দাতাদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। গডফাদারদেরকে ধরা না গেলে কদিন পরে আবার একই অবস্থার সৃষ্টি হবে। একই সাথে ঘোষণা দিয়ে অভিযান শুরু করায় অনেকেই গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ পেয়েছে।নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে তারা ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। এ জন্য অভিযান শুরু করার আগে সীমান্তপথে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত ছিল। অনেকের মতে, মাদক ব্যবসার সাথে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কতিপয় সদস্যও জড়িত। তাদেরকে নিবৃত করা না গেলে শুধুমাত্র মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। এ বিষয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, মাদকে জড়িত থাকার অভিযোগ ইতিমধ্যে ৬৭ জন পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

তাদের মধ্যে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরেও রয়েছে। এদের মধ্যে র‌্যাবের তিন জন সদস্য আছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মাদক গ্রহণের দায়ে পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের তিনজনই নোয়াখালী জেলার। বাকি দুজন খাগড়াছড়ি ও হবিগঞ্জের। ওই কর্মকর্তা জানান, পুলিশ সদর দফতর থেকে সারা দেশের পুলিশের জন্য ১০ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে বলা হয়, যেসব পুলিশ সদস্য মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন, তাদের চিহ্নিত করে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা, প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।
জানা গেছে, চলমান মাদক বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে রাজধানীর ১০০ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এদের দ্রæত শাস্তির আওতায় আনতে ডিএমপির আটটি অঞ্চলে (ক্রাইম) কর্তব্যরত উপ-কমিশনারদের (ডিসি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, ডিএমপি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে উপ-কমিশনারদের এক বৈঠকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেন ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। একজন কর্মকর্তা জানান, ডিএমপির আট অঞ্চলের অপরাধের তথ্য নিয়ে গোয়েন্দা বাহিনী তালিকাটি তৈরি করে ডিএমপি কমিশনারের হাতে জমা দিয়েছেন।

মূলত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিয়ে তালিকাটি করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে চার বা ততোধিক মাদক সংশ্লিষ্ট মামলা রয়েছে। তালিকা নিয়ে ইতোমধ্যে পুলিশ মাঠে নেমেছে। তবে ঢাকার বাইরে আগেভাগে অভিযান শুরু হওয়ায় ঢাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ বিদেশ চলে গেছেন। আবার কেউ গেছেন ভারতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে অভিযান শুরুর পর ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার মাদকের গডফাদার ইশতিয়াক ওরফে কামরুল হাসান এবং নাদিম গা-ঢাকা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে। উত্তরা এলাকার মাদক স¤্রাট ফজলুল করিম, বাড্ডার রিয়াদ, সাব্বির, এনায়েত, শরিফ, বনানীর আনোয়ার, কদমতলীর বিল্লালের ভাই ইমরানসহ অনেক গডফাদারই গা-ঢাকা দিয়েছে। এদিকে, কুমিল্লা সিন্ডিকেটের অধীনে ঢাকায় অন্তত ৫০ জন ইয়াবা ডিলারখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে।

এই ৫০ জন ডিলারের আওতায় তিন শতাধিক সেলসম্যান প্রতিদিন খুচরা হিসেবে ৫০ সহস্রাধিক পিচ ইয়াবা বিক্রি করে থাকে। এই গ্রুপের অন্যতম ডিলার হচ্ছেন মতিঝিল ফকিরাপুলের গরমপানি গলির জাপানী বাবু। তার হাত গলিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজার পিচ ইয়াবা বাজারজাত হয়। সিন্ডিকেটের আরেক ডিলার হচ্ছেন শাহজাহানপুরের খোড়া মানিক ওরফে দয়াল মানিক। কমলাপুর বিআরটিসি বাস ডিপো ও আশপাশ এলাকার মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কেরফা বিল্লাল নামের এক সন্ত্রাসী। রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকায় ইয়াবা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে হালিম ও তার সহযোগিরা। খিলগাঁও তিলপাপাড়া কালভার্ট এলাকায় নকল হিজড়া সিন্ডিকেট এখন মাদক কেনাবেচার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। সেখানে ময়নার নেতৃত্বে শাহআলম, রুবি, সনেকা, নাচনেওয়ালী, মিতু, সাবের, ছালামসহ ১৫/১৬ জন নকল হিজড়ার সমন্বয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্র রয়েছে। তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে খিলগাঁও ঈদগা মসজিদ এলাকার ডাকসাইটে মাদক ব্যবসায়ি রেখা আক্তার ফাতেমা ও গোড়ান ঝিলপাড়ের মাদক সন্ত্রাসী হান্নান।

শান্তিবাগ ঝিল মসজিদ এলাকায় লিটন, সোহেল, আমতলায় উজ্জ্বল, নূরা, শাহজাহানপুর রেলগেট বাজারে মুরগী মাসুম, ইকবাল, শহীদবাগে হোন্ডা মিলন গা-ঢাকা দিলেও মাদক বেচাকেনা গতকালও অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একজন।কুমিল্লা মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম এজেন্ট হিসেবে বাড্ডা-রামপুরা এলাকায় ইয়াবা ও ফেনসিডিল বিক্রি দেখভাল করেনজয়নাল আবেদীন। রাজনৈতিক প্রভাবকে পুজি করে জয়নাল শতাধিক সেলসম্যান দ্বারা দুটি থানার মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বাড্ডার ডিআইটি রোড এলাকায় রিয়াজ পরিচালনা করে ইয়াবার খুচরা বাজার।
ডিবি’র সোর্স পরিচয়দানকারী সুমনের নিয়ন্ত্রণে চলছে বাড্ডা-শাহজাদপুরের ফেনসিডিল বাজার। ইয়াবার আরেক ডিলার দক্ষিণ বাড্ডার ‘বাবা রহমত’ মাদক বাজার গড়ে তুলেছে বনানী থানার মহাখালী এলাকায়। বন ভবন সংলগ্ন সিঙ্গার গলির আস্তানা থেকে সে ও তার সহযোগিরা প্রতিদিন অন্তত পাঁচ হাজার পিচ ইয়াবা বিক্রি করে থাকেন। সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবারও এই স্পটগুলো সচল থাকলেও গতকাল শুক্রবার অনেক স্পটই ছিল ফাঁকা। ইতোমধ্যে গডফাদারদের মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে গেছে।

একইভাবে ঢাকার বাইরের গডফাদারদের অনেকেই পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে পালিয়েছে। আমাদের আদমদীঘি উপজেলা (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার সান্তাহার পৌরসভা এলাকায় ইয়াবা ও হোরোইনের ব্যবসা করতো বেশ কয়েকজন। পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদেরকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে তারা চুটিয়ে মাদক ব্যবসা করতো। অভিযান শুরুর পর অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছে। এর মধ্যে শহরের রথবাড়ি এলাকার ওপোন, মুন্নী, মুন্নীর দেবর হযরত ও চা বাগান এলাকার নজু রাজশাহীর গোদাগাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে গেছে।
জয়পুরহাট হিলি এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানকার গডফাদারদের মধ্যে বেশ কয়েকজন দু’ সপ্তাহ আগেই হিলি সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে গেছে। পাঁচবিবি এলাকার একজন মাদক ব্যবসায়ী জানান, হিলি সীমান্তে মাদক ব্যবসা ছাড়াও অস্ত্র ব্যবসা জমজমাট। দুদেশের চোরাকারবারীদের মধ্যে সখ্যতা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে কোনো অভিযান শুরু হলে ভারতের চোরাকারবারীরা বাংলাদেশের মাদক বা অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে দেরি করে না। এ কারনে হিলি, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পাঁচবিবি, জয়পুরহাট এলাকার মাদক ব্যবসায়ীসহ চোরাকারবারীরা সহজে ধরা পড়ে না। ভারত এদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান সম্পর্কে বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর এএসএম আমানউল্যাহ বলেন, মাদকের আগ্রাসন বন্ধের জন্য এর রুট বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত পথে মাদক আসা বন্ধ করার সাথে সাথে যারা এগুলোর নেপথ্যে জড়িত তাদেরকে ধরতে হবে। গডফাদারদের ধরা না গেলে কদিন পরে আবারও একই অবস্থার সৃষ্টি হবে।
খবরটি শেয়ার করুন

About admin

Check Also

‘দিল্লি লুটের সময়ও এত টাকা লুট হয়নি’

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *