Breaking News
Home | সংবাদ | যেভাবে ইয়াবায় আসক্ত হচ্ছে অভিজাত পরিবারের সন্তানরা

যেভাবে ইয়াবায় আসক্ত হচ্ছে অভিজাত পরিবারের সন্তানরা

ইয়াবা। ছবি: সংগৃহীত
বশির ভাইকে (ছদ্মনাম) আমি চিনি। জেলা শহরের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা। বেশ সুনাম রয়েছে কর্মস্থলে। সবকিছুতে যেমন তৎপর তেমন সৎ ও দক্ষ। পরিবার থাকে ঢাকায়। পরিবার বলতে স্ত্রী আর দু’ছেলে মেয়ে। আসলে ছেলেমেয়ের পড়াশুনার জন্যই তাদের বাড়ি ভাড়া করে ঢাকায় রেখেছেন। তিনি জেলা সদরে থেকে সব খেয়াল করছেন। আমি সেভাবেই জানি। এক মিটিংয়ে তার সঙ্গে পরিচয়।

আজ সকালে তিনি হঠাৎ ফোন করেছিলেন। কোনো কথা বলেননি, কেবল বলেছেন, ‘খুব বিপদে আছি। দেখা করা জরুরি।’
সন্ধ্যায় চেম্বারে ঢুকেই বললেন, ‘ভাই আমি একটু সময় নিয়ে কথা বলতে চাই। জানি না আপনি আমাকে কী ভাববেন? আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমি নিরুপায়। এখন আমার বাঁচা মরা সমান। আজ আমি একজন ব্যর্থ মানুষ, ব্যর্থ বাবা, ব্যর্থ সব।’ তার চোখ ছলছল করতে লাগল।
কিছুটা চমকে উঠলাম, কী ব্যাপার, কী হলো? অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত নামিদামী সৎ নির্ভীক একজন মানুষের এ কেমন অসহায় আত্মসমর্পণ।
– বললাম, ‘ভাই কী ব্যাপার। কী হয়েছে?’

– আমি শেষ। লজ্জায় আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারছি না এখন। আমার সব পরিশ্রম, সব আশা ভরসা সব ধুলোয় মিশে গেছে। কেন আমার মরণ হলো না! কান্নায় তাঁর গলা ধরে আসলো, তিনি হাত দুটো দিয়ে চোখ মুখ গুঁজলেন।
কী বলব বুঝতে পারছি না। বললাম, ‘কী হয়েছে বশির ভাই?’
-‘ভাই, আমার দুই ছেলে মেয়ে ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়েছে’, আর কিছু বলতে পারলেন না। হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন। পুরুষ মানুষরা সাধারণত কাঁদে না, কাঁদলে বুঝতে হবে ভয়ানক কোনো কিছুর আভাস।
– এটা কীভাবে হলো? ইয়াবাতে ছেলেমেয়েরা হঠাৎ করে আসক্ত হয় না। কিছু কিছু লক্ষণ দেখলে আগে থেকেই টের পাওয়া যায়। আপনারা খেয়াল করেননি?

– না, বুঝতে পারিনি। আমিতো ওদের সঙ্গে থাকি না, আমিতো এখানে থাকি।
আসলে তার জন্যে না জানাটাই স্বাভাবিক। চাকরি করেন ঢাকার বাইরে। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের রাখছেন ঢাকায়। তাদের পড়াশুনা করাচ্ছেন অভিজাত এলাকার একটা নামীদামী ইংলিশ মিডিয়াম কলেজে। মা তাদের দেখভাল করতেন। কিন্তু সহজ সরল মা তাদের দিন দিন ইয়াবা আসক্ত হয়ে যাবার বিষয়টা একেবারেই ধরতে পারেননি।
ভাইবোন একই কলেজে পড়াশুনা, সব সময় একসঙ্গেই থাকতো। রাতে বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি কথা বলে কিংবা গান বাজনা কলেজের ফাংশনের কথা গিটার নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাহিরে যেতো প্রথম প্রথম। মা ভাবতেন, ভাইবোন এক সঙ্গেইতো যাচ্ছে। কী আর হবে? তার এ বিশ্বাস বা বেখেয়ালটাই কাল হয়েছে।

ভাইবোন দুজনে একসঙ্গেই ইয়াবাসেবী সহপাঠী ও ইয়াবা ব্যবসায়ীদের টার্গেটে পড়ে যায়। সহপাঠী, বন্ধু যারা ইয়াবা খায় তারা পয়সার সংকুলান করতে না পেরে এক পর্যায়ে নিত্য নতুন ধনী বন্ধুদের কৌশলে ইয়াবা বা মাদক খাওয়াতে থাকে। এটার ওটার সঙ্গে মিশিয়ে খাইয়ে তাকে আসক্ত করে তুলে।
প্রথম প্রথম নানান ছুতোয় ফ্রি খাওয়ায়। আসক্তি করে তুলে ইয়াবা বন্ধুদের সবাইকে নিয়ে একটা চেইন তৈরি করে। এজন্যে তারা টার্গেট করে বন্ধনহীন বা অভিভাবকশূন্য ক্ষমতাবান ধনী পরিবারের সহজ সরল সন্তানদের। ক্ষমতাবান টার্গেট করে যাতে ফেঁসে না যায়, পাশাপাশি মাদক কেনার পয়সা কড়ির অভাব না হয়।

যাই হোক বশির সাহেব জানালেন, কিছু বন্ধুসহ দুদিন আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদেরকে আটক করেছে স্কুলেরই তত্ত্বাবধানে থাকা এক হোস্টেল থেকে চরম আপত্তিকর আর নেশাগ্রস্থ অবস্থায়। পরে অভিভাবক ডেকে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, সবাইকেই।
তার কান্না থামাতে বললাম, বশির ভাই, ‘ভেঙে পড়বেন না, ওরা কই, সঙ্গে এনেছেন?’
জ্বী এনেছি। জোর করে ধরে বেঁধে এনেছি। আসতে চায় না। দু’তিন দিন থেকে আমার কাছে এনেছি। আটকে রেখেছি। কিন্তু দুজনেই এখন পাগলের মতো আচরণ করছে। আসবাবপত্র ভাংচুর করছে। একবার ভেবেছিলাম দুইটাকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করি কিন্তু পারলাম না। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন।

বললাম, ঠিক আছে। কাঁদবেন না। কান্নায় তো লাভ হবে না। ধৈর্য ধরুন। ওদের ভেতরে পাঠিয়ে দিন। আমি কথা বলে দেখি। হতাশ হবার কিছু নেই। কয়েকদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে। বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা যে হয়নি এতেই শুকরিয়া। নেশাগ্রস্তরা নেশার টাকা না পেলে চুরি, ছিনতাই, নানান অনাচার, অসামাজিক কাজ করতে দ্বিধা করে না। এমন কি খুন খারাবীতে জড়িয়ে যেতে যায়। ভাগ্য ভালো আপনার। এসব কিছুই হয়নি। ওদেরকে ভেতরে নিয়ে আসুন।
দুই.

দু’ভাইবোন আমার সামনা সামনি বসা। দু’জনেই জিন্স আর টিশার্ট। বেশ স্মার্ট। তবে খুব ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত।
– কী ব্যাপার আংকেল তোমরা কেমন আছো?
– জ্বী, আংকেল ফাইন, উই আর ওকে। মাম এন্ড ডেড আর ফানিলি সিরিয়াস। দেয়ার ইজ নাথিং টু বি সো সিরিয়াস। উই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড, হোয়াই দে ডুইং সো, দুজনে একসঙ্গে উত্তর দিল।
– তাই?

– ইয়েস আংকেল। উই ডু নাথিং রঙ। জাস্ট টেইক সাম স্লিপিং পিল লাইক মেথঅ্যামফিটামিন এন্ড ইটস অকেশনালি। বাট মাম এন্ড আর রিএকটিং টু মাচ। দে আর সো স্কেয়ার্ড, শিট। ডিসগাস্টিং।
– পাশে বসা বশির ভাই ক্ষেপে গেলেন। ‘দেখলেন ভাই…দেখলেন, দুইটা কি বেয়াদব হয়েছে।’ আমরা নাকি ডিসগাস্টিং।
– আমি বললাম, ‘আপনি ধৈর্য ধরুন, একটু থামুন ওদের বলতে দিন। আমি শুনি। অতেই কাজ হবে। আর ভালো হয় আপনি যদি একটু বাইরে বসেন।

– ছেলে মেয়েরা ইয়েস ইয়েস বলে বলল, ‘আঙ্কেল প্লিজ টেল হিম টু গো আউট, ডিসগাসটিং, ব্যাকডেটেড।’
আমি ইশারা করলাম বশির ভাইকে বেরিয়ে যেতে।
দেখো আঙ্কেল, আমি যা বুঝার বুঝে ফেলেছি। তোমরা যে রিয়েক্ট দেখিয়েছো তাতে মোটামুটি আমি ক্লিয়ার। সামথিং রং, কারণ তোমাদের এ রিয়েক্ট নরমাল না।

তোমাদের বাবা আমার বন্ধু। তোমরা যদি ভালো হতে চাও তাহলে কয়েকটা বিষয় আমাকে খুলে বল। হাইড করো না। আমি একশত ভাগ আশাবাদী তোমরা ভালো হয়ে যাবে। তোমরা যে পথে পা বাড়িয়েছো তার পরিণাম মৃত্যু।
তাছাড়া তোমাদের বয়স কম, বিষয়টা হয়তো না বুঝেই করে ফেলেছ। এখন আর লুকানোর কিছু নাই। সবকিছু খুলে বললে আমি সাহায্য করবো তোমাদের এ পথ থেকে ফিরতে। ভাইবোন দুজনেই চুপ করে বসে রইলো কিছুক্ষণ। একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল দু’তিন বার। কিছুটা ইতস্তত, কিছু বলবে কি বলবে না।
তারপর শুরু করল দু’জনেই। বলতে বলতে এক সময় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। তবুও সব বলল একে একে। কীভাবে জড়াল, কীভাবে আড়াল করল সবকিছু। এসব যেমন চাঞ্চল্যকর তেমনি অমানবিক, হৃদয় বিদারক আবার কিছুটা রহস্যাবৃত।

তিন.

খারাপ সহপাঠীদের সঙ্গে পড়ে প্রথমে বড় ভাইটি ইয়াবাসক্ত হয়ে পড়ে। পরে ছোটবোনকেও জড়ায়। ছোটবোনকে জড়ানোর কথা সহপাঠীরাই বলে। তাতে মা বাবা নাকি সন্দেহ করবে না। হয়েছেও তাই। ওরা একসঙ্গে অনেকজন ইয়াবা নেয়। আরও কয়েকজন আছে, তারাও ভাই-বোন।
ইয়াবা-মাদকটির মূল উপাদান মেথঅ্যামফিটামিন। একসময় যা সর্দি ও নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া ও ওজন হ্রাস করতে ব্যবহৃত হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ক্লান্তি দূর করতে, সজাগ থাকতে ও মেজাজ ফুরফুরে রাখতে সেনারা ব্যবহার করত মেথঅ্যামফিটামিন। পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ বিশেষত শিক্ষার্থী, গাড়িচালক ও খেলোয়াড়রা এর যত্রতত্র ব্যবহার শুরু করে। পরে এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উদঘাটিত হওয়ায় এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। তবে বিশ্বের কয়েকটি দেশে এর উৎপাদন চলতেই থাকে।

মেথঅ্যামফিটামিনের সঙ্গে চা কফি সিগারেট মিশিয়ে ব্যবহৃত হতে থাকে মাদকদ্রব্য হিসেবে। বিশ্বে থাইল্যান্ডে এই মাদকটির উৎপাদন হয় সবচেয়ে বেশি। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশগুলোতে।
ইয়াবার অনেক ছদ্মনাম রয়েছে, যেমন ইন্ডিয়ায় একে বুল-বুলি, চায়না তে মাগো এবং বাংলাদেশে পাগলা বড়ি, বিচি, জিনিশ, বাবা ট্যাবলেট নামে ডাকে ইয়াবাসেবী ও ব্যবসায়ীরা।
চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।

About admin

Check Also

উত্তরায় ৯নং সেক্টরে পুলিশ কর্মকর্তার ‘আত্মহত্যা’

রাজধানীর উত্তরার ৯নং সেক্টরের একটি বাসা থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *